উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
দেশে ডিমের উৎপাদন গত এক দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন ছয় কোটির বেশি ডিম উৎপাদিত হলেও স্বস্তিতে নেই খামারিরা। ফিড, বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির বাড়তি খরচে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে খামার থেকে ভোক্তার হাতে ডিম পৌঁছানোর মধ্যবর্তী পর্যায়ে একাধিক পক্ষ যুক্ত থাকায় উৎপাদকেরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। ফলে উৎপাদন বাড়লেও অনেক খামারির লাভ বাড়ছে না, আর ভোক্তাদেরও কিনতে হচ্ছে তুলনামূলক বেশি দামে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে দেশের পোলট্রি খাতের এই পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ বছর দিবসটির ৩০তম বার্ষিকী। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডিমে পুষ্টি, ডিমে শক্তি, ডিমে আছে রোগ মুক্তি’। ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দেশজুড়ে শোভাযাত্রা, সেমিনার ও বিভিন্ন প্রচারমূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে ডিম বিতরণের উদ্যোগও রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২ হাজার ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। দৈনিক হিসাবে এই পরিমাণ ছয় কোটির বেশি। বর্তমানে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা প্রায় ১৩৭টি। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রাপ্যতা ২০০টিতে উন্নীত করা।
তবে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেও খামারিদের আর্থিক অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদের মতে, উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় খামারিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন, অথচ সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যবর্তী পর্যায়ে থাকা ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মুনাফা করছেন। তাঁর দাবি, গত ২০ মাসে দেশের ব্রিডার খামারগুলো প্রায় ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
তিনি মনে করেন, পোলট্রি খাতকে এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায্য মূল্য, পণ্যের মান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী উৎপাদনব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। চাহিদার সঙ্গে বাচ্চার সরবরাহের সমন্বয়, জাতীয় পোলট্রি নীতির আইনি ভিত্তি, বীমা সুবিধা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কোল্ড চেইনে বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ১৯১ কোটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২ হাজার ৪৪০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খামারিদের আয় বাড়েনি।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানান, ফিডসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বাড়ায় একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১১ টাকা। অন্যদিকে খামার পর্যায়ে ডিমের গড় বিক্রয়মূল্য জানুয়ারিতে ছিল ৭ টাকা ৯১ পয়সা, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে প্রায় ১১ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়ায়। খামার থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পথে ডিমের দাম সাধারণত আরও ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত বাড়ে।
এই দামের ব্যবধানের প্রভাব সরাসরি পড়ছে উৎপাদক ও ভোক্তার ওপর। রাজশাহীর পবা উপজেলার খামারি মোহাম্মদ হাফিজ জানান, তাঁর খামারে ডিম উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু লাভের পরিমাণ বাড়েনি। ছোট খামারিদের প্রতিদিনের উৎপাদিত ডিম দ্রুত বিক্রি করতে হয়। বড় খামারিরা সরাসরি বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ পেলেও ছোট খামারিরা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন।
জামালপুরের খামারি মাহবুব হোসেনের ভাষ্য, ঢাকার পাইকারি বাজারের দর মুঠোফোনে জানা গেলেও সেই দামে স্থানীয় পর্যায়ে ডিম বিক্রি করা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে উৎপাদক পর্যায়ের দাম ও ভোক্তার কেনা দামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
পোলট্রি খাতের উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মুরগির খাবার। ভুট্টা ও সয়াবিনজাত উপকরণসহ ফিডের কাঁচামালের দাম বাড়ায় খামার পরিচালনার খরচও বেড়েছে। এর সঙ্গে বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির ব্যয় যুক্ত হওয়ায় ছোট ও মাঝারি খামারিরা বেশি চাপে পড়ছেন। বাজারে ডিমের দাম কমে গেলে লোকসান গুনতে হয়, আবার দাম বাড়লেও সেই বাড়তি আয়ের পুরো অংশ খামারিদের হাতে পৌঁছায় না।
বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান ফিডের কাঁচামালের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, দেশে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের মতো উপকরণের সরবরাহ আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে এসব পণ্যের রপ্তানিতে সাময়িক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি আমদানি করা কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোরও পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, ফিডের দাম কমানো সম্ভব হলে ডিম ও মুরগির উৎপাদন ব্যয় কমবে, যা বাজারদর সহনীয় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রহমান বলেন, পোলট্রি শিল্পকে বিজ্ঞানভিত্তিক, নিরাপদ ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে নিতে হবে। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, খামারির লাভ, পণ্যের নিরাপত্তা ও বাজারের স্বচ্ছতাকেও সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহজামান খান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ফিডের কাঁচামালের দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদকদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প খাদ্য উপকরণ ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের খামারিদের ফিডের দামসংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, উৎপাদন খরচ কমাতে খামারিদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক খামারিদের সহজ ঋণ, বিদ্যুৎ সুবিধা ও সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনতে কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগও রয়েছে। তাঁর মতে, উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন, যাতে খামারিরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারেন এবং ভোক্তাদেরও অতিরিক্ত দাম দিতে না হয়। পাশাপাশি ডিম ও মাংসসহ প্রাণিজ খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন পর্যায় থেকেই নিয়মিত তদারকি জরুরি।
দেশে ডিমের প্রাপ্যতা বাড়লেও আন্তর্জাতিক তুলনায় মাথাপিছু ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বে ডিম উৎপাদনে শীর্ষে চীন, যেখানে বছরে প্রায় ৬১ হাজার ৭০০ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। আর মাথাপিছু ডিম খাওয়ার হিসাবে মেক্সিকো এগিয়ে; দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে ৪০৯টি ডিম খান। জাপানে এই সংখ্যা ৩৩৭টি এবং উন্নত দেশগুলোতে গড়ে ২৭০ থেকে ৩০০টি।
পুষ্টিবিদদের মতে, তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়ার সহজ উৎস ডিম। শিশুদের পুষ্টি, শারীরিক বৃদ্ধি ও মেধার বিকাশে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতেও ডিম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে পুষ্টির এই উৎসকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করতে উৎপাদন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নির্ধারণে ভারসাম্য আনা প্রয়োজন।
বিশ্ব ডিম দিবসে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের পোলট্রি খাত এখন উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি লাভজনকতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জের মুখে। ফিডের ব্যয় কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, প্রান্তিক খামারিদের আর্থিক সহায়তা এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই খাত আরও টেকসই হতে পারে। এতে খামারিরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি সাধারণ মানুষের জন্যও ডিমের দাম সহনীয় রাখার সুযোগ তৈরি হবে।