উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম জানিয়েছেন, অনিয়মে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের কিসমত-জাফরাবাদ আবাসন প্রকল্পে মাটি ভরাটের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, কিসমত-জাফরাবাদ প্রকল্পের মাটি ভরাটসংক্রান্ত ঘটনাটি তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের আগের। তবে বিষয়টি জানার পর তিনি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছেন। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংস্থার প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে কিছু কর্মকর্তার নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ ছিল। বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ২০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অন্য অনিয়মের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
এদিকে কিসমত-জাফরাবাদ আবাসন প্রকল্পে মাটি ভরাটের কাজ নিয়ে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দুদকের তদন্তসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৯ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কিসমত-জাফরাবাদ মৌজায় আবাসিক প্লট উন্নয়নের জন্য ৪২ কোটি ৩৭ লাখ ২১ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের মাটি ভরাট, আরসিসি সড়ক, ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৫৬ লাখ ৩২ হাজার ৭৯৮ টাকা। মাটি ভরাটের কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৮৭ হাজার ৯৩ দশমিক ১৬ ঘনমিটার মাটি ভরাটের বিপরীতে প্রতি ঘনমিটার ২২৯ টাকা ২৫ পয়সা হিসাবে মোট ১ কোটি ৯৯ লাখ ৬৬ হাজার ১৬ টাকার বিল দাখিল করে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে পরিশোধ করা হয় ১ কোটি ৩৭ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৪ টাকা।
তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের মাটি ভরাট না করেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরস্পরের যোগসাজশে সরকারি ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার ৮৯৪ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলছে। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান গত ২৫ আগস্ট সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পাঠানো মতামতে উল্লেখ করেন, মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও প্রকল্পের কাজ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা নেই। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির কাজ আটকে থাকায় এই মতামতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটি শুরুর পর্যায়ে মাটি ভরাট না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ থাকায় আবাসন প্রকল্পটির বাস্তবায়নও বিলম্বিত হয়েছে। প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, কাজের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে, দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলার মুখে থাকা তিন প্রকৌশলীর বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের একজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অলিউর ইসলামকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পর সংস্থার ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা থাকা অবস্থায় পদায়ন ও দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় থেকে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলা চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিষ্পত্তি, সরকারি অর্থের ব্যবহার যাচাই এবং প্রকল্পের কাজ পুনরায় এগিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো এখন তদন্ত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
অপরাধবিষয়ক আইনজীবী সৈয়দ আহম্মেদ গাজীর মতে, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ বা মামলা থাকলেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না; যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দায় নির্ধারণ করতে হয়।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতি নিরূপণ এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আবাসন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ। চেয়ারম্যানের ঘোষিত কঠোর অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে তদন্তের ফলাফল, বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।