উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
প্রবাসে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে না। নথিপত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ উল্লেখ করেই দায়িত্ব শেষ করার প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি। অকালমৃত্যু প্রতিরোধ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের বিকল্প নেই।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ১৮ হাজার ১৬৬ জন প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ এসেছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে এসেছে আরও ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ। এসব পরিসংখ্যান প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মরদেহের সঙ্গে থাকা নথিপত্রে প্রায় ৬৬ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাসহ অন্যান্য কারণের উল্লেখ থাকে। কিন্তু বিদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর যে কারণ জানায়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনেক সময় তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয় না। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, প্রতিবছর প্রায় ২৩ থেকে ২৪ লাখ তরুণ দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের একটি বড় অংশের দেশে কর্মসংস্থান না হওয়ায় জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যেতে হয়। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। অথচ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এসব কর্মীর নিরাপত্তা ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। এসব দেশের নির্মাণ খাতে কর্মরত অনেক শ্রমিককে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত তাপ ও প্রতিকূল কর্মপরিবেশ তাঁদের স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। অভিবাসন খাতের গবেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর পেছনে অতিরিক্ত তাপ গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অল্প বয়সী কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনাও বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।
প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর পেছনে শুধু অসুস্থতা বা প্রাকৃতিক কারণ নয়, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, নির্যাতন, হত্যা এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনাও রয়েছে। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও নির্যাতনের ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিটি ঘটনার ধরন অনুযায়ী তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে একই ধরনের মৃত্যু প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।
প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা তাঁর পরিবারের অধিকার। মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে নির্ধারণ করা গেলে পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিপূরণ ও বিমাসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারেন। বিপরীতে, মৃত্যুর কারণ যাচাই না করে দায়সারাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরিবারগুলো ন্যায়বিচার ও প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দূতাবাস এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমিকদের সুরক্ষা বাড়ানো এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে অযথা বিলম্ব বন্ধ করাও জরুরি।
প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু শুধু তাঁদের পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি দেশের শ্রমবাজার, জনশক্তি ও অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত। তাই প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অকালমৃত্যু কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।