উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামালসহ মোট পাঁচজন পলাতক আসামিকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেওয়া হয়, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী, অভিযুক্ত পাঁচ পলাতক আসামির নাম, পরিচয় ও আত্মসমর্পণের নির্দেশ সম্বলিত একটি বিজ্ঞপ্তি একটি বাংলা এবং একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করতে হবে। এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনসম্মুখে তাদের আত্মসমর্পণের বাধ্যবাধকতা জানানো হবে। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে, যা বিচার প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
জুলাই মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের ভিত্তিতে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ধরনের অভিযোগের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ট্রাইব্যুনাল মনে করছে, পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতি বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে, তাই তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই মামলায় মোট আটজন ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তারা হলেন- সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, যিনি পূর্বে উচ্চ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীন; এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর তদন্ত চলছে এবং তারা বিচারিক প্রক্রিয়ার সম্মুখীন।
অন্যদিকে, যে পাঁচজন আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, যিনি তার প্রগতিশীল চিন্তাধারা এবং শিশু সাহিত্যের জন্য পরিচিত। এছাড়াও রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অন্যান্য পলাতক আসামিরা হলেন- নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, এবং ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন। এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের এই আদেশের ফলে পলাতক আসামিদের ওপর আইনি চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেল। বিজ্ঞপ্তির নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যদি তারা আত্মসমর্পণ না করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর মধ্যে সম্পত্তি ক্রোক, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং অনুপস্থিতিতে বিচার (trial in absentia) পরিচালনার মতো কঠোর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার এখতিয়ার অনুযায়ী সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে এই মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করছে, যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় এবং অপরাধীরা শাস্তি পায়। এই আদেশ বিচার বিভাগের কার্যকারিতা ও দৃঢ়তার একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে।
দেশের শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক কর্মী এবং ছাত্র সমাজের সঙ্গে জড়িত এমন পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এবং তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশের বিষয়টি জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহের বিচারিক নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই মামলার রায় দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।