বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্পাদকীয়

জন্মনিবন্ধনে ভুল: ভোগান্তি কমাতে দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকে

জন্মনিবন্ধন সনদ একজন নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথি। শিক্ষা, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, চাকরি ও বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে এই সনদের প্রয়োজন হয়। অথচ জন্মনিবন্ধনে নাম ও ঠিকানার মতো মৌলিক তথ্যেও ভুল থাকায় বহু মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। নিবন্ধন কার্যালয়ের ভুল সংশোধন করতে গিয়ে নাগরিকদের সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে। এ পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরছে।রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি নতুন জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে। একই সময়ে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে। এর আগের বছর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯ লাখ ১৭ হাজার। এত বিপুলসংখ্যক সংশোধনের প্রয়োজন কেন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।জন্মনিবন্ধনে বাংলা ও ইংরেজি তথ্যের অসংগতি এবং উদ্ভট অক্ষর বা ভুল নাম-ঠিকানা যুক্ত হওয়ার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে এক ভাষায় তথ্য সঠিক থাকলেও অন্য ভাষার অংশে ভুল তথ্য দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ত্রুটি সংশোধনের কাজ কয়েক বছর ধরেই চলছে। ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণে শুধু বাংলা সনদেই প্রায় ১০ কোটি ভুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এত বড় সমস্যার পরও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ভুল শনাক্ত ও বিনা মূল্যে সংশোধনের কার্যকর উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নাগরিকদেরও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অনলাইনে আবেদন করার পর বিভিন্ন স্থানীয় ও সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করতে হয়। ডিজিটাল সেবা চালুর মূল উদ্দেশ্য যেখানে মানুষের ভোগান্তি কমানো, সেখানে একাধিক দপ্তরে ঘুরে একই কাজ সম্পন্ন করতে হলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।ভোগান্তির পাশাপাশি আর্থিক চাপও কম নয়। নাম বা ঠিকানা সংশোধনের সরকারি ফি ৫০ টাকা। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে এ খাতে নাগরিকদের ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। গত বছর ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। সরকারি ফির বাইরেও কম্পিউটারের দোকানে আবেদন করানো, যাতায়াত এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার মতো অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে অনেককে।জন্মনিবন্ধনের ভুল ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয় এবং সংশোধনের নামে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নাগরিকদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি না হয়।নাগরিকের দায়িত্ব হলো সঠিক তথ্য দেওয়া। কিন্তু সঠিক তথ্য জমা দেওয়ার পর নিবন্ধন কার্যালয়ের ভুলের কারণে সনদে অসংগতি তৈরি হলে তার দায় আবেদনকারীর ওপর চাপানো ন্যায়সংগত নয়। পুরোনো নিবন্ধনের ভুলগুলো নিরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা, কর্তৃপক্ষের ভুল বিনা মূল্যে সংশোধন করা এবং আবেদনকারীকে চূড়ান্ত তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সফটওয়্যারে স্বয়ংক্রিয় যাচাইব্যবস্থা চালু ও নিয়মিত তদারকি জোরদার করতে হবে।জন্মের পরপরই নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবন্ধনব্যবস্থার সমন্বয় বাড়ানো যেতে পারে। এতে ভুল তথ্য প্রবেশের ঝুঁকি কমবে এবং নাগরিকদের পরবর্তী সময়ে সংশোধনের জন্য হয়রানির শিকার হতে হবে না।জন্মনিবন্ধনের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা শুধু নাগরিকের দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। বছরের পর বছর ভুল চলতে দেওয়া এবং তা সংশোধনের দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নাগরিকের সময় ও অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করে সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জন্মনিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

জন্মনিবন্ধনে ভুল: ভোগান্তি কমাতে দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকে
🔒