বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ধ্বংস: ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি

গত ২৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক তৎপরতা মারাত্মকভাবে জোরদার করেছে ইসরায়েল। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামলাকারীদের এলাকা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যা হেবরন শহরে ফিলিস্তিনিদের ভবন ও বাড়িঘর ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। এই পদক্ষেপ অঞ্চলটিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।জানা গেছে, হেবরনের একটি চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর অতর্কিত হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন এবং আরও তিনজন আহত হন। পরবর্তীতে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে দুই হামলাকারীও নিহত হন। এই ঘটনার পরপরই ইসরায়েল প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে, হামলাকারীরা যে এলাকা থেকে এসেছে, সেই অঞ্চলকে 'ধ্বংস করে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হবে'। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত, এবং কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। যদিও এই অভিযানের নির্দিষ্ট সময়সীমা তিনি জানাননি।এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অভিযোগ বাড়ছে, বিশেষ করে বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে এ ধরনের সহিংসতা প্রকট আকার ধারণ করে। এছাড়াও, মাত্র চার দিন পরেই ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা এই সামরিক পদক্ষেপের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে ইসরায়েলি সেনা ও বন্দুকধারীদের মধ্যে তীব্র গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুই বন্দুকধারী একটি গাড়ি থেকে নেমে চেকপোস্টে থাকা সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। তাদের একজনের হাতে পিস্তল এবং অন্যজনের হাতে অ্যাসল্ট রাইফেলের মতো অস্ত্র ছিল বলে ফুটেজে প্রতীয়মান হয়। এরপর সেনারা পাল্টা গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হামলাকারীদের গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে, এবং তাদের ধারণা ছিল যে বন্দুকধারীরা কাছের রুট ৩৫ সড়কে আরও বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু চেকপোস্টের মুখোমুখি হওয়ায় সেখানেই তারা গুলি চালাতে শুরু করেন।প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হেবরন এবং পাশের হালহুল শহরের চারপাশে অবরোধ আরোপের কথাও জানিয়েছেন, যেখানে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘদিনের একটি চর্চা। তবে ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই নীতির তীব্র সমালোচনা করে এটিকে 'সমষ্টিগত শাস্তি' হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। নেতানিয়াহু অবশ্য পশ্চিম তীরের শরণার্থীশিবিরগুলোতে ইসরায়েলের পূর্বের সামরিক অভিযানের উদাহরণ টেনেছেন, যেখানে আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ঘটনা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অর্থমন্ত্রী ও উগ্র ডানপন্থী নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরে গাজা বা লেবাননের মতো সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বিরোধী নেতাদের সমালোচনা করে বলেছেন যে, নির্বাচনের আগে হামলার আশঙ্কা নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করে তারা সরকারকে দুর্বল করছেন এবং ভবিষ্যতে কোনো হামলার জন্য বিরোধী নেতারাও দায়ী থাকবেন। তবে বিরোধী নেতারা নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং হামলাকারীদের প্রতিহত করা ব্যক্তিদের প্রশংসা করেছেন।পশ্চিম তীরে সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘের তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ইসরায়েলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে পশ্চিম তীরে অন্তত ৯৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় পশ্চিম তীরে চারজন ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে শুক্রবারের হামলায় নিহত দুই সেনার হিসাব ওই সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়। হেবরনে নতুন করে বাড়িঘর ধ্বংস এবং পশ্চিম তীরে বড় সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি অঞ্চলটিতে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু সরকারের নিরাপত্তানীতিও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে, যা আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ধ্বংস: ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি
🔒